Download Screen Reader

মাল্টিমিডিয়া টকিং বইয়ের দায়িত্বে এবার এনসিটিবি

15 November, 2022

Source : দৈনিক কালবেলা

Reading Time: 1 Minute

দৃষ্টি-শ্রুতি প্রতিবন্ধীসহ সকল শিক্ষার্থীদের পড়ার ধরণ বদলে দিয়েছে মাল্টিমিডিয়া টকিং বই। ২০২৩ সালের জন্য চলতি বছরের ডিসেম্বরে বইটি দৃষ্টি ও শ্রুতি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়ার দায়িত্বে রয়েছে এনসিটিবি।

চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের আইসিটি ডিভিশনের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এমপি স্বাক্ষরিত শিক্ষা উপমন্ত্রী মাহবুল হাসান চৌধুরী এমপিকে ডিও লেটারে জানান, কোভিডকালীন একীভূত ডিজিটাল শিখন উদ্যোগকে ইউনেস্কো একটি উত্তম চর্চা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে। মাল্টিমিডিয়া টকিং বই ব্যবহারের ফলে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অনেকেই জিপিএ-৫ পেয়েছে। ২০২১ সালে ডিজিটাল বাংলাদেশ দিবসে প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যেও মাল্টিমিডিয়া টকিং বই-এর বিষয়টি পুনঃউল্লেখ করেছেন।

চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি এটুআই প্রকল্প পরিচালক ( যুগ্ম সচিব) ড. দেওয়ান মুহম্মদ হুমায়ুন কবীর স্বাক্ষরিত শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ‘প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের প্রতি শিক্ষাবর্ষের শুরুতে মাল্টিমিডিয়া টকিং বই প্রদানের জন্যে পত্র দেওয়া হয়। পত্রে এও উল্লেখ করা হয়, ১ম থেকে ১০ম শ্রেনি পর্যন্ত আনুমানিক ১০ হাজার শিক্ষার্থী বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত রয়েছে। এর কপি এনসিটিবি’র চেয়ারম্যানকেও প্রদান করা হয়।

আইসিটি ডিভিশনের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এমপির ডিও লেটারের পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি শিক্ষা উপমন্ত্রী মাহবুল হাসান চৌধুরী এমপি এনসিটিবি’র চেয়ারম্যানকে ২০২৩ শিক্ষা বছরের শুরুতে মাল্টিমিডিয়া টকিং বই তৈরি ও বিতরণের নির্দেশ প্রদান করেন।

এর পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব খালেদা আখতার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) স্বাক্ষরিত চলতি বছরের ৬ এপ্রিল ‘প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের প্রতি শিক্ষাবর্ষের শুরুতে মাল্টিমিডিয়া টকিং বই প্রদান প্রসঙ্গে আরেকটি পত্র জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যানকে প্রদান করা হয়।

পত্রে প্রতি বছরের মতো চলতি বছরও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীসহ সকল প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের কাছে মাল্টিমিডিয়া টকিং বই সরবরাহে বিধি-মোতাবেক পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও উল্লেখ করা হয়।

এ প্রসঙ্গে এনসিটিবি’র চেয়ারম্যান ফরহাদুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, এটুআইয়ের সঙ্গে মাল্টিমিডিয়া টকিং বই নিয়ে মত বিনিময় হয়েছে। তাদের কাছে আমরা কারিগরী সহায়তা চাচ্ছি। ওরা এখনো আমাদের কিছু জানায়নি। শীঘ্রই আমরা টেন্ডার ডাকব। ডিসেম্বরের মধ্যে মাল্টিমিডিয়া টকিং বই দৃষ্টি ও শ্রুতি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিবো।

এটুআই শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আফজাল হোসেন সারওয়ার প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য মাল্টিমিডিয়া টকিং বই প্রসঙ্গে কালবেলাকে বলেন, প্রথম-দ্বিতীয় এবং ষষ্ঠ-সপ্তম শ্রেনিতে এনসিটিবি’র নতুন কারিকুলাম হওয়ায় পাঠ্যপুস্তকও পরিবর্তন হচ্ছে। আগামীতে আরো কিছু বইয়ে নতুন কারিকুলাম হবে। এখন থেকে কাজ শুরু করলে ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন বই কনভার্ট করা অর্থাৎ মাল্টিমিডিয়া টকিং বই করা সম্ভব।

এটুআই প্রকল্প পরিচালক ( যুগ্মসচিব) ড. দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ূন কবির এ প্রসঙ্গে কালবেলাকে বলেন, এনসিটিবি’র যখন প্রয়োজন হবে আমরা সঙ্গে সঙ্গে কারিগরী সহায়তা সহ সব ধরণের সহযোগিতা করব। এই বই তৈরিতে খরচ পড়বে প্রায় ৩০ লাখ টাকা। এছাড়া মুক্ত পাঠ প্লাটফর্মের আওতায় ভিডিও কনটেন্ট তৈরি, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন সহযোগিতায় আমরা এগিয়ে আসব।

বাংলাদেশে দৃষ্টি-শ্রুতি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যবহার উপযোগী এনসিটিবি’র পাঠ্যপুস্তক অনুযায়ী প্রণীত হয় মাল্টিমিডিয়া টকিং বুক ১ম থেকে ৫ম এবং ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি। ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর বইয়ের প্রথম উদ্বোধন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিতরণ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এখন থেকে প্রতি বছর অন্যান্য বইয়ের পাশাপাশি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য মাল্টিমিডিয়া এবং ব্রেইল বই বছরের শুরুতে নিশ্চিত করবে। এই বইয়ের কপি রাইট যাতে বাংলাদেশে থাকে তা নিশ্চিত করার নির্দেশনাও তিনি প্রদান করেছিলেন।

২০২২ সাল পর্যন্ত দৃষ্টি-শ্রুতি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য বইয়ের অডিও এবং প্রতিবন্ধীদের উপযোগী বই তৈরির দায়িত্বে ছিল এটুআই প্রকল্পের সার্ভিস ইনোভেশন ফান্ডের ‘মাল্টিমিডিয়া টকিং বুক’ প্রকল্পের আওতায়। ভাস্কর ভট্টাচার্যের তত্ত্বাবধানে এই প্রজেক্ট বাস্তবায়নে সহযোগিতা করেছেন চট্টগ্রামের একটি স্থানীয় সংস্থা ইপসা। বইটি তৈরিতে কাজ করেছিলেন এক দল উদ্ভাবনী চিন্তার মানুষ। তাদের প্রায় ৮০ ভাগই শারীরিক ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। কেউ টাইপ করেছেন, কেউ তা এডিটিং করেছেন।

এ প্রসঙ্গে এটুআই এর রিসোর্স পারর্সন ভাস্কর ভট্টাচার্য কালবেলাকে বলেন, এটুআই প্রকল্পের সার্ভিস ইনোভেশন ফান্ডের আওতায় ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশন (ইপসা) প্রথম থেকে দশম শ্রেণীর পর্যন্ত ফুল টেক্স, ফুল অডিও প্রণয়ন করা হয়েছে। দৃষ্টি প্রতিবন্ধীসহ সকল শিক্ষার্থীর উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দৃষ্টি ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীসহ সাধারণ শিক্ষার্থীরা অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইস এবং কম্পিউটারে সহজেই পাঠের বিষয়বস্তু শুনতে ও পড়ে বুঝতে পারেন। ইউনিকোডে প্রণীত বইগুলো ডিজিটাল ভার্সনে থাকায় এর টেক্সট সহজে ব্যবহার করে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসের কনটেন্ট তৈরি করা যায়। সহজে ব্রেইলে রূপান্তরও করা যায়।

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে সুরিকরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ হাসান। তিনি চোখে দেখতে না পেলেও প্রজেক্টের মাধ্যমে মাল্টিমিডিয়া টকিং বই দিয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠ দান করেন।

এ প্রসঙ্গে তিনি কালবেলাকে বলেন, মাল্টিমিডিয়া টকিং বইয়ের সুবিধা হলো একই সঙ্গে দেখা, শোনা এবং পড়ানো যায়। একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের বই নিয়েও পাঠ দান করতে পারেন। আমার দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতার কারণে তাদের মতো ছাপা বই পড়াতে পারি না। মাল্টিমিডিয়া টকিং বই আমার সেই প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করে দিয়েছে। এর মাধ্যমে সাবলীলভাবে শিক্ষার্থীদের পাঠ দান করতে পারি। আমাদের সময় এই সুবিধে না থাকায় মোবাইল, টেপ রেকর্ডারে রেকডিং করে নিজে নিজে ব্রেইল নোট করে লেখাপড়া করতে হয়েছে। তা ছিল অনেক কষ্টের।

বাংলাদেশে নিবন্ধিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় চার লাখ। দৃষ্টি – শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা এই মাল্টিমিডিয়া টকিং বুক নামের সফটওয়্যারের মাধ্যমে খুব সহজেই পাঠ্যবই পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু এই শিক্ষার্থীরা ২০২৩ সালে নতুন শ্রেণিতে মাল্টিমিডিয়া টকিং বুক কি আদৌ পাবেন! এটা এখন নির্ভর করছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এর কাজের গতির উপর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


RELATED POSTS